সরওয়ার কামাল
স্থিরতার ছদ্মবেশে আমাদের চারপাশের বিশ্বচরাচর
প্রতিনিয়ত অস্থির ঘূর্ণিপাকে ঘুরছে। এটি কেবল বিশ্বগোলকের আবর্তন নয়; নয় রাজনৈতিক তর্কের
কোলাহল কিংবা অর্থনৈতিক গ্রাফের ওঠানামার হিসাব। এই অস্থিরতা দৃশ্যমান খোদ মানুষের
যাপিত জীবন, তার দৈনন্দিন শ্রম, সম্পর্ক ও অস্তিত্বের লড়াইয়ের সূক্ষ্ম সামাজিক প্রক্রিয়ায়।
পোলিশ সমাজবিজ্ঞানী জিগমুন্ট বাউম্যান এই প্রবণতাকে চিহ্নিত করেছিলেন লিকুইড মডার্নিটি
বা তরল আধুনিকতা বলে। এটি এমন এক সমাজপরিবেশ, যেখানে যেকোনো স্থায়ী প্রতিষ্ঠান, মানবীয়
সম্পর্ক, নিজস্ব পরিচয় এবং কাজের নিশ্চয়তা চোখের পলকে স্বরূপ বদলে ফেলে। তরল জলের মতো
যার কোনো নির্দিষ্ট আকার নেই। কোনো দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকারের পরিবর্তে সম্পর্কগুলো তৈরি
হচ্ছে শর্তহীনতার শর্তে; টিকে আছে আরোপিত নমনীয়তা ও আপসে। ফলত নিশ্চিত আশ্রয়ের জায়গায়
দেখা দিচ্ছে অচেনা অনিশ্চয়তা।
শ্রমিকের যে শ্রম একসময় কারখানা প্রাঙ্গণে
নির্দিষ্ট সময়সীমায়, দৃশ্যমান মালিকের চোখ রাঙানি কিংবা চুক্তির অধীনে বাঁধা ছিল, উত্তরাধুনিক
পুঁজি তাকে ধোঁয়াশার মতো বায়বীয় করে দিয়েছে। চাকরির শর্ত, স্থায়িত্ব, কর্মপদ্ধতির রূপান্তর,
দক্ষতার পরিবর্তনশীল চাহিদা, অনিশ্চয়তা, প্রতিশ্রুতিহীনতা -এসব মিলে কোনটা চাকরি, কোনটা
বেকারত্ব, কোনটা উদ্যোগ আর কোনটা ফ্রিল্যান্সিং বোঝা দুষ্কর। এমন তরল শ্রমের যুগে বিদ্যমান
কর্মসংস্থান সংকটকে বুঝতে হলে কেবল বেকারত্বের সরকারি পরিসংখ্যান দেখলে চলবে না। সমস্যাটিকে
বুঝতে হবে, কাজের ধরন, মান, শারীরিক ও সামাজিক নিরাপত্তা, আত্মমর্যাদা এবং ভবিষ্যতের
সার্বিক অনিশ্চয়তা সমেত।
বাংলাদেশের শ্রমবাজারের বাস্তব রূপ অত্যন্ত
জটিল ও বৈপরীত্যে ভরা। একদিকে রয়েছে বিপুল পরিমাণ তরুণ জনসংখ্যা,
যাকে
পরিসংখ্যানের ভাষায় উৎসাহব্যঞ্জক ‘জনসংখ্যাগত লভ্যাংশ’ বলা হয়। অন্যদিকে এই তরুণদের
অধিকাংশের জন্যই কোনো দৃশ্যমান বা টেকসই কাজের সংস্থান নেই। এখনো বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তির
প্রায় ৮৪ শতাংশেরও বেশি মানুষ কাজ করেন অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে। কৃষি, নির্মাণশ্রম, ছোট
দোকানের মেকানিক, পরিবহন খাত, দিনমজুরি, ফেরিওয়ালা কিংবা ভাসমান কেনাবেচার মতো জায়গায়
কোটি কোটি মানুষ মেহনত করছেন। কিন্তু তাদের পায়ের নিচে কোনো শক্ত মাটি নেই। নেই কোনো
লিখিত নিয়োগপত্র, বীমা, পেনশন কিংবা অসুস্থতায় কাজের বিরতি নেওয়ার আইনি অধিকার। এই
অপ্রাতিষ্ঠানিকতা কোনো সাময়িক ঘটনা নয়; এটি তরল শ্রম, দেশের শ্রমব্যবস্থার এক দীর্ঘস্থায়ী
কাঠামোগত প্রপঞ্চ, যা বাউম্যানের তরল আধুনিকতার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ।
এই পুরনো অপ্রাতিষ্ঠানিকতার ওপর এসে চেপে
বসেছে প্রযুক্তিনির্ভর নতুন এক অর্থনীতি- ডিজিটাল গিগ ইকোনমি।
রাইড শেয়ারিং, ফুড ডেলিভারি, অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং কিংবা ই-কমার্স তরুণদের সামনে আয়ের
নতুন দিগন্ত খুলে দিচ্ছে ঠিকই, তবে তা স্বাধীন কাজের ছদ্মবেশে তৈরি করছে চরম অনিশ্চয়তা।
এই প্ল্যাটফর্মে শ্রমিকদের আপাতদৃষ্টিতে ‘উদ্যোক্তা’ বা স্বনিয়োজিত পেশাজীবী বলা হলেও,
প্রকৃতপক্ষে তারা পরিচালিত হন এক অদৃশ্য অ্যালগরিদম ও ডেটা-চালিত কাঠামোর দ্বারা। তাদের
কাজের রেটিং, মজুরির হার কিংবা শাস্তিমূলক অ্যাকাউন্ট স্থগিতকরণ—সবই ঘটে অদৃশ্য কোনো
ডিজিটাল কলকাঠির নির্দেশে। কোনো কর্তৃপক্ষ কিংবা নিয়োগকর্তাকে চোখে দেখা যায় না বলে
এতে ক্ষোভের প্রতিকার বা দাবি জানানোর পথ থাকে না।
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান দুইটি খাত-
তৈরি
পোশাক শিল্প এবং প্রবাসী শ্রমিকদের রেমিট্যান্স—উভয়ই আন্তর্জাতিক
তরল শ্রমের নিখুঁত উদাহরণ। গোলোকায়নের হাওয়া তৈরি পোশাক শিল্পে লাখ লাখ গ্রামীণ নারী
ও পুরুষকে নিয়োজিত করার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। বৈদেশিক মুদ্রা এনেছে। কিন্তু তার বিনিময়ে
তাদের ওপর সওয়ার হয়েছে অতিরিক্ত কাজের সময়, অপ্রতুল মজুরি এবং ঝুঁকিপূর্ণ কর্মপরিবেশ।
রানা প্লাজা কিংবা তাজরীন ফ্যাশনসের মতো ট্র্যাজেডি প্রমাণ করে, বিশ্ব পুঁজির চেইনে
মুনাফার হার ক্রমবৃদ্ধিমান রাখার জন্য কীভাবে শ্রমিকের জীবনের সুরক্ষা কম্প্রোমাইজ
করা হয়।
প্রতি বছর লাখ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্য,
মালয়েশিয়া বা সিঙ্গাপুরে পাড়ি জমান। তারা এক দেশ থেকে অন্য দেশে দেশান্তরি হন, কিন্তু
তারা যে দেশে যান, সে দেশের সামাজিক সুরক্ষা বা আইনি সুরক্ষার আওতায় প্রয়োজনীয় সুবিধা
পান না। কাফালা ব্যবস্থার মতো বাধ্যতামূলক শ্রমনীতি, প্রতিকূল নিয়োগপ্রক্রিয়া ও কাগজপত্রের
জটিলতায় তারা অন্য দেশে গিয়ে প্রায়ই সম্পূর্ণ অধিকারহীন ও অসহায় বন্দিতে পরিণত হন।
এতে শ্রমিকদের আইনি প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ থাকে সীমিত।
প্রথাগত শিল্প-সমাজে শ্রমের সঙ্গে যুক্ত থাকত
চাকরির নিরাপত্তা, যেখানে প্রতিষ্ঠানই শ্রমিকের স্বাস্থ্য, পেনশন ও অবসরের দায়িত্ব
নিত। কিন্তু তরল শ্রমের যুগে শ্রমিকের কাজের সংযোগটি ক্রমাগত ঢিলে হয়ে যায়। শ্রমিক
হয়তো আজ রাইড হাঁকাচ্ছেন, কাল ই-কমার্সের ডেলিভারি করছেন, পরশু ফ্রিল্যান্স কাজ খুঁজছেন—কিন্তু তার ঝুঁকি
নিবারণের জন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকে না। শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা
কাঠামো এখনো মূলত কিছু নির্দিষ্ট সরকারি বা বড় প্রাতিষ্ঠানিক চাকরির সাথেই বাঁধা। ফলে
অপ্রাতিষ্ঠানিক বা গিগ-শ্রমিকেরা কোনো দুর্ঘটনা বা অসুস্থতায় পড়লে এক নিমেষেই চরম দারিদ্র্যের
খাদে তলিয়ে যান।
আজকের শ্রমবাজারে আরেকটি বড় সমস্যা হলো, দক্ষতার
মেয়াদ অবিশ্বাস্যভাবে কমে আসা। তুর্কি কবি নাজিম হিকমত লিখেছিলেন, ‘বিংশ শতাব্দিতে
মানুষের শোকের আয়ু বড় জোর এক বছর’। কিন্তু আজ দেখা যাচ্ছে, মানুষের দক্ষতারও আয়ু কমে
এসেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন ও রোবোটিক্সের দ্রুত বিকাশের ফলে আজকের অর্জিত
দক্ষতা কয়েক বছরের মধ্যে অচল হয়ে পড়ছে। অথচ বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা আজও কেবল সনদ
ও পরীক্ষানির্ভর বিদ্যার ছকে আটকে আছে। তরল শ্রমবাজারের সাথে তাল মেলাতে যে ধারাবাহিক
পুনঃপ্রশিক্ষণ ও জীবনব্যাপী শিক্ষার প্রয়োজন, তা আমাদের দেশে সুলভ ও সুসংগঠিত নয়। যদিও
জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো কিছু কাজ করছে, কিন্তু
প্রযুক্তির গতির তুলনায় তার বিস্তার এখনো অত্যন্ত সীমিত।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই তরল শ্রমের অভিঘাত
মোকাবিলায় নীতিগত পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। ডেনমার্কসহ ইউরোপের কিছু দেশে ফ্লেক্সিকিউরিটি
মডেল চালু করা হয়েছে। এর মূল কথা হলো নিয়োগকর্তা প্রয়োজন
অনুযায়ী কর্মী নিয়োগ বা বাতিল করতে পারবেন ঠিকই, তবে চাকরি হারালেও রাষ্ট্র শ্রমিকের
আয়-সহায়তা, চিকিৎসা ও দ্রুত পুনঃপ্রশিক্ষণের দায়িত্ব নেবে। অর্থাৎ, সুরক্ষা নির্দিষ্ট
কোনো প্রাতিষ্ঠানিক চাকরির সাথে নয়, বরং ব্যক্তিশ্রমিকের সাথে যুক্ত থাকে। সিঙ্গাপুরে
‘স্কিলসফিউচার’ কর্মসূচির মাধ্যমে সারা জীবনব্যাপী দক্ষতা হালনাগাদ করার সুযোগ দেওয়া
হয়। এমনকি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ২০২৬ সালে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম অর্থনীতিতে শোভন
কাজ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশন গ্রহণ করেছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই জটিল সংকট থেকে
বের হতে হলে কেবল কিছু নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি করলেই চলবে না। সমস্যা সমাধানে প্রয়োজন
বহুমাত্রিক নীতিগত পদক্ষেপ। সামাজিক সুরক্ষাকে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের গণ্ডি থেকে বের
করে শ্রমিকের জাতীয় পরিচয়পত্র বা ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টের সাথে যুক্ত করা বাঞ্ছণীয়,
যেন কাজ বদলালেও পেনশন বা স্বাস্থ্যবীমার অধিকার বহাল থাকে। চুক্তিভিত্তিক এবং অ্যাপ-নির্ভর
শ্রমিকদের আইনি সুরক্ষা, সর্বনিম্ন মজুরির গ্যারান্টি ও অভিযোগ নিষ্পত্তির সুনির্দিষ্ট
ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। যদিও শ্রমঘন এলাকায় সাশ্রয়ী দামে টিসিবির পণ্য কেনা যায়,
তবুও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, গৃহকর্মী, কৃষিশ্রমিক ও দিনমজুরদের জন্য সহজলভ্য ও রাষ্ট্রীয়
অনুদানপ্রাপ্ত কন্ট্রিবিউটরি সামাজিক বীমা ব্যবস্থা চালু করা সমীচীন। শিক্ষাব্যবস্থায়
সংস্কার এনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন ও যুগের উপযোগী প্রযুক্তিগত পুনঃপ্রশিক্ষণের
সুনির্দিষ্ট কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে। প্রবাসী শ্রমিকদের নিয়োগ খরচ কমানো, আইনি সহায়তা
প্রদান এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সনদ বাস্তবায়নে শক্ত কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।
জিগমুন্ট বাউম্যানের ‘তরল আধুনিকতা’র ধারণা
আমাদের এক নতুন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। তরল আধুনিকতার মতো তরল শ্রমের যুগে শ্রমের
ধরন পরিবর্তিত হওয়া মানে কেবল অর্থনৈতিক সমীকরণ বদলানো নয়; এটি মানুষের পারিবারিক জীবন,
আত্মপরিচয় ও সামাজিক মর্যাদাকে চূর্ণ করে দেয়। তাই কেবল তরলতার নামে, নমনীয়তার নামে,
পুঁজিকে অবাধ ছাড় দেওয়া নয়; বরং অনিশ্চয়তার মুখে পড়া মানুষের জীবনের পাটাতনে সুরক্ষার
মজবুত ভিত্তি গড়ে তোলা প্রয়োজন। তরল শ্রমের অনিশ্চয়তার সঙ্গে যদি সামাজিক সুরক্ষার
মেলবন্ধন না ঘটানো যায়, তবে তা কেবল পুঁজির মুনাফাই বাড়াবে। যাবতীয় ঝুঁকি মোকাবিলা
করতে হবে অসহায় ব্যক্তি শ্রমিককে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন এক কর্মপরিবেশ গঠন করা—যেখানে কাজ ও পেশা
পরিবর্তনের স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু তার সাথে মানুষের বেঁচে থাকার নিরাপত্তা ও মর্যাদাটুকু
হারিয়ে যাবে না।
সরওয়ার কামাল ।। লেখক ও গবেষক।
সরওয়ার কামাল ।। লেখক ও গবেষক।
Comments