Skip to main content

উপকূলীয় শিক্ষার্থীদের জন্য ক্ষতিপূরক শিক্ষা

সরওয়ার কামাল

বাংলাদেশের উপকূলীয় ১৯ জেলায় জলবায়ুজনিত বিপদাপদ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মাত্রা এখন খালি চোখেই আঁচ করা যায়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যেসব ভৌত পরিবর্তন ঘটছে তার প্রভাব সরাসরি পড়ছে উপকূলীয় সমাজ, অর্থনীতি, যোগাযোগ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাক্ষেত্রে। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, লবণপানির হানা, এবং প্যারাবন উজাড়ের কারণে উপকূলীয় সমাজে বহুমাত্রিক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। দৃশ্যমান পরিবর্তনের অন্তরালে যে ঝুঁকিসমূহ নীরবে ঘাতকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে, তা হলো শিক্ষাক্ষেত্রে প্রান্তিকীকরণের ঝুঁকি। তাই উপকূলীয় শিক্ষার্থীদের জন্য দরকার বিশেষ ধরনের শিক্ষাদর্শন।

 এ সময়ের বৈশ্বিক উন্নয়ন এজেন্ডায় সমতাভিত্তিক মানসম্মত শিক্ষা অগ্রাধিকার পাচ্ছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় চতুর্থ নম্বরেই রয়েছে 'সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক মানসম্মত শিক্ষা এবং যাবজ্জীবন শিক্ষার সুযোগ’। কিন্তু এই লক্ষ্য অর্জনের পথে রয়েছে ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, বহুমাত্রিক দারিদ্র্য, অপুষ্টি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং কাঠামোগত প্রান্তিকীকরণের মতো নানা প্রতিবন্ধকতা। এসব প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণে ‘ক্ষতিপূরক শিক্ষা’ হতে পারে একটি ন্যায্য শিক্ষা কৌশল। সচরাচর দেখা যায়, বিদ্যালয়ে যারা পড়তে আসে তাদের সামাজিক পরিবেশ ও অর্থনৈতিক সামর্থ্য সমান নয়। যেসব শিশু বঞ্চিত ও পশ্চাৎপদ পরিবেশ থেকে আসে, তাদের শিক্ষার ঘাটতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য দরকার বাড়তি সহায়তা। বাংলাদেশের উপকূলীয় জনপদের শিশুরা কাঠামোগত প্রান্তিকতা ও সীমাবদ্ধতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত। জলবায়ু পরিবর্তন এই উপকূলীয় সমাজকে অধিকতর প্রান্তিক করে তুলছে। এ কারণেই উপকূলীয় শিক্ষার্থীদের দরকার ক্ষতিপূরক শিক্ষা।

  ক্ষতিপূরক শিক্ষা হলো এমন কিছু নীতি ও অতিরিক্ত সহায়ক ব্যবস্থা, যা অবকাঠামোগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর শিক্ষাগত বৈষম্য দূরীকরণে ভূমিকা রাখে। এই শিক্ষাদর্শন শুধু বিদ্যালয়ে ভর্তি বৃদ্ধি করার ওপর গুরুত্ব দেয় তা নয়, বরং দারিদ্র্য, ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা, পুষ্টিহীনতা, সাংস্কৃতিক বৈষম্য, পরিবেশগত ঝুঁকি এবং সামাজিক বঞ্চনার মতো কাঠামোগত সমস্যাগুলোকেও বিবেচনায় নেয়।

 ক্ষতিপূরক শিক্ষা একদিক থেকে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা, পুষ্টি সহায়তা, আর্থিক প্রণোদনা, উপবৃত্তি, স্কুল ফিডিং কর্মসূচি, ভাষাভিত্তিক সহায়ক শিক্ষা, মনোসামাজিক সহায়তা, জনসম্পৃক্ততা, নমনীয় শিক্ষাব্যবস্থা এবং সর্বোপরি, যুক্তিনির্ভর শিক্ষাকে বোঝায়। তবে উপকূলীয় ও প্রান্তিক জনপদে যেসব সুবিধা সহজে নিশ্চিত করা যায়, এমন অবকাঠামো এবং সামাজিক সহায়তা কার্যক্রমকেও অন্তর্ভুক্ত করা যায়।

 ক্ষতিপূরক শিক্ষার ধারণা বিকশিত হয়েছে ১৯৬০-এর দশকে। ওই সময়ে দু’টি যুগান্তকারী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, যার মধ্যে ১৯৬৬ সালে প্রকাশিত কোলম্যান প্রতিবেদন এবং ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত প্লাউডেন প্রতিবেদন এই ধারণাকে জনগ্রাহ্য করে তোলে। কোলম্যান প্রতিবেদনে শিক্ষার সমতা বিষয়ক প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে দেখানো হয় যে, স্কুলের অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধার চেয়ে শিক্ষার্থীর পারিবারিক পটভূমি এবং সামাজিক পরিবেশ শিক্ষাগত উন্নতি অর্জনের প্রধান নির্ধারক। শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার বাধা দূর করতে না পারার কারণে শিক্ষার মাধ্যমে সামাজিক গতিশীলতা ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের প্লাউডেন প্রতিবেদনে দেখানো হয়, প্রতিকূল পারিবারিক পরিস্থিতি এবং সাংস্কৃতিক বঞ্চনা শিক্ষার্থীদের শিখন-সামর্থ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করে। এই দুই প্রতিবেদন নীতিনির্ধারকদের ভিন্নভাবে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে। এ দু’টি প্রতিবেদনের সারমর্ম থেকে সহজে অনুমেয় যে, সামাজিকভাবে পশ্চাৎপদ শিক্ষার্থীদের শিক্ষাগত চাহিদা পূরণে দরকার বিশেষ নীতি ও কর্মসূচি।

 শিক্ষাক্ষেত্রে ক্ষতিপূরক উদ্যোগের কথা পাড়তে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জনসনের স্মরণ নিতে হয়। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে Head Start কর্মসূচি চালু করেন। ওটা ছিল দরিদ্র শিশুদের জন্য একটি সমন্বিত প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কর্মসূচি, যা তিন থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা ও পারিবারিক অংশগ্রহণকে একীভূত করে। অন্যদিকে মেক্সিকোর Progresa কর্মসূচির কথা উল্লেখ করা যায়, যার মাধ্যমে প্রায় চার ভাগের এক ভাগ মেক্সিকান পরিবারকে নগদ সুবিধা প্রদান করা হয়েছিল। এই কর্মসূচির মূল শর্ত ছিল-শিশুরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাবে এবং স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করবে। এই কর্মসূচি শিক্ষায় ভর্তির হার  ও ধারাবাহিকতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করে। একইসাথে তা তরুণদের কাজে নিযুক্তি বিলম্বিত করে এবং শিক্ষা অর্জনের কালব্যাপ্তি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।

 বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার চিত্র মিশ্র। স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে শিক্ষার সুযোগ ও ভর্তি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু শিক্ষার গুণগত মান আন্তর্জাতিক মানের চেয়ে ক্রমে নিম্নগামী হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে যত বেকার রয়েছে, তার মধ্যে ১৩.৫ শতাংশই স্নাতক ডিগ্রিধারী। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা গড়ে মাত্র ৬.৫ বছরের সমতুল্য শিক্ষা অর্জন করে, অর্থাৎ তাদের প্রাপ্ত শিক্ষার প্রকৃত মান প্রায় সাড়ে চার বছর পিছিয়ে আছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ হলো জাতীয় বাজেটের ১৪.৫৬ শতাংশ এবং জিডিপির ২.০০ শতাংশ, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর গড়ের তুলনায় অনেক কম।

 বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু-সংকটাপন্ন দেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে উপকূলীয় দ্বীপাঞ্চলীয় এলাকায়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশুর শিক্ষা ব্যাহত হচ্ছে। তাপপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার মতো জলবায়ুজনিত ঘটনাগুলো শিক্ষার নিয়মিত ধারাকে বিঘ্নিত করে। চরম আবহাওয়ার কারণে স্কুল বন্ধ থাকা, বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং শিক্ষার্থীদের বাস্তুচ্যুত হওয়া, এসব উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় নিয়মিত ঘটনা। বাংলাদেশের পাঠ্যক্রমে এখনও অর্থপূর্ণ জলবায়ু শিক্ষার অন্তর্ভুক্তি ঘটেনি। এটি শিক্ষার্থীদের জলবায়ু অভিযোজন সক্ষমতা অর্জনে অন্তরায় তৈরি করছে।

 উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়, সমুদ্র উপকূলে বাংলাদেশের একটি পাহাড়ি দ্বীপ মহেশখালী। ভৌগোলিক বৈচিত্র্য ও ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও এই দ্বীপ দীর্ঘকাল ধরে অবকাঠামোগত অনুন্নয়ন, দারিদ্র্য, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং কাঠামোগত প্রান্তিকীকরণের শিকার। শিক্ষাক্ষেত্রে এই প্রান্তিকতার কিছু বাস্তব কারণ রয়েছে। দ্বীপটির যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। দ্বীপের প্রবেশদ্বার জেটিঘাটেই রয়েছে রাহুগ্রস্ততা ও নৈরাজ্যের দুর্বিপাক। বর্ষাকালে জলমগ্ন রাস্তা, জলোচ্ছ্বাস, ভাঙন এবং নৌপথের অনিশ্চয়তা মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করে। বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে দীর্ঘ পথ হাঁটতে হয় বলে অনেকসময় বিদ্যালয়ে উপস্থিতি অনিয়মিত হয়ে পড়ে।

 দারিদ্র্য ও শিশুশ্রমের দুষ্টচক্র যেন দ্বীপাঞ্চলীয় বিধি। মহেশখালীর অধিকাংশ মানুষ মৎস্য শিকার, লবণ চাষ, পান চাষ, দিনমজুরি এবং ক্ষুদ্র কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল। আয়ের অনিশ্চয়তা ও কাজের মৌসুমি ধরণ এখানকার মানুষের ধারাবাহিক উপার্জন ও জীবিকা ব্যাহত করে। ফলে অনেক পরিবারই শিশুদের দিয়ে কাজ করায়। তবে এই শিশুশ্রম কেবল যে দারিদ্র্যের কারণেই ঘটছে তা নয়। এটি দারিদ্র্য পুনরুৎপাদনের একটি শক্তিশালী প্রক্রিয়াও বটে। শিশুদের মধ্যে যারা কিছুটা পরিশ্রমী, তারা কাজের পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে যায় বলে ক্লান্তি ও মনোযোগহীনতায় ভোগে।

 কন্যাশিশুর শিক্ষা এখনও নানাবিধ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি। বাল্যবিয়ে, রক্ষণশীল মানসিকতা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাইবার নিপীড়ন এবং নিরাপত্তাহীনতা মেয়েদের শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। উপকূলীয় অঞ্চলে বাল্যবিয়ের প্রবণতা তুলনামূলকভাবে বেশি। দূরবর্তী বিদ্যালয়ে যাতায়াত এবং পৃথক স্যানিটেশন ব্যবস্থার অভাব মেয়েদের নিয়মিত উপস্থিতি ব্যাহত করে। যার ফলে মাধ্যমিক স্তরে মেয়েদের ঝরে পড়ার হার বেশি।

 এদিকে প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল উপকূলীয় জনগোষ্ঠী ক্রমাগতভাবে সম্পদের ওপর তাদের অধিকার ও কর্তৃত্ব হারাচ্ছে। সম্প্রতি মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং জ্বালানি অবকাঠামো নির্মাণ অঞ্চলটিকে অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। কিন্তু উন্নয়নজনিত বাস্তুচ্যুতি, জীবিকার ক্ষতি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ক্ষয়ক্ষতি পূরণে সংবেদনশীল পরিকল্পনা দেখা যায়নি। এসব উন্নয়নের প্রভাব মূল্যায়নের জন্য যে জরিপ করা হচ্ছে তার পদ্ধতিতত্ত্ব নিয়েও বিদ্ব্যৎসমাজে প্রশ্ন রয়েছে। শিক্ষাগত যোগ্যতা ও দক্ষতার অভাবে বহু স্থানীয় মানুষ পরিবর্তনশীল অর্থনৈতিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আধুনিক শিল্প ও জ্বালানি প্রকল্পের সুবিধা গ্রহণে অক্ষম জনগোষ্ঠী পুনরায় প্রান্তিকতায় নিপতিত হচ্ছে।

 উপকূলীয় এলাকায় পর্যাপ্ত বিদ্যালয় নেই। অনেক বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, বিশুদ্ধ পানি, বিদ্যুৎ, পাঠাগার কিংবা আধুনিক শিক্ষাউপকরণ নেই। কোথাও কোথাও শিক্ষক সংকটও প্রকট। ডিজিটাল শিক্ষার যুগেও বহু এলাকায় স্থিতিশীল ইন্টারনেট ও বিদ্যুৎ সুবিধা নেই। মহেশখালী থেকে বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ করা হলেও খোদ মহেশখালীতে এখনো পর্যন্ত গ্যাসের সংযোগ স্থাপিত হয়নি।

 উন্নত শিক্ষা ও উচ্চতর দক্ষতা ছাড়া সম্পদ হারানো ক্ষতিগ্রস্ত জনগণ তাদের ক্ষতি পোষাতে পারে না। ক্ষতিপূরক শিক্ষা মূলত শিক্ষাকেন্দ্রিক ক্ষতিনিবারক কৌশল। এর প্রথম ধাপ হলো ভৌত অবকাঠামোর রূপান্তর। উপকূলীয় অঞ্চলে একইসঙ্গে স্কুল ও সাইক্লোন শেল্টার হিসেবে ব্যবহার করা যায় এমন ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস সহনশীল বহুমুখী দুর্যোগ কেন্দ্র র্নির্মাণ করা যায়। শ্রেণিকক্ষের লাগসই পুনর্নকশা, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং মেয়েদের জন্য পৃথক স্যানিটেশন ব্যবস্থা এসব বিদ্যালয়কে অধিকতর কার্যকর করে তুলতে পারে।

 ক্ষেত্রবিশেষে, ভাসমান বিদ্যালয় চালু করা যায়। জোয়ারি ভাঙন কবলিত উপকূলীয় এলাকায় নমনীয় সমাধান প্রয়োজন। মহেশখালীতে সমাজ-ভিত্তিক প্রাক-প্রাথমিক কেন্দ্র স্থাপন করা যেতে পারে, যেখানে পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা ও খেলাধুলাভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করা হবে। স্কুল ফিডিং কর্মসূচি শুধু পুষ্টিহীনতা দূর করবে না, বরং বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়ানোর একটি কার্যকর প্রণোদনা হিসেবেও কাজ করবে। সেইসাথে, শর্তসাপেক্ষ নগদ সহায়তা কর্মসূচি দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য কার্যকর হতে পারে। পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া যায় শর্তসাপেক্ষে, যদি শিশুরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে যায় ও স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করে, তবে তারা আর্থিক প্রণোদনা পাবে। এ ধরনের কর্মসূচি, বিশেষ করে, বাল্যবিবাহ কমাতে এবং কন্যাশিশুদের শিক্ষা অব্যাহত রাখতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

 স্থানীয় উদ্যোগের মাধ্যমে, বিশেষ করে সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে, বাংলাদেশে নারীশিক্ষার প্রতিবন্ধকতা দূর করার কিছু উদাহরণ রয়েছে। লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য নিরসন এবং নারী ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রেও শিক্ষার গুরুত্ব রয়েছে। যোগাযোগ সুবিধা, নিরাপত্তা এবং নারীবান্ধব পরিবেশ বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বৃদ্ধি করতে পারে। উপযুক্ত শিক্ষাক্রম তাদের স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সচেতন করে তুলবে। পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু স্থানীয় বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকায় শিক্ষার্থীরা নিজেদের জীবন, সংস্কৃতি ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে শিক্ষার সংযোগ খুঁজে পায় না। পাঠ্যক্রমে উপকূলীয় জীবন, পরিবেশ, মৎস্য সংস্কৃতি ও দুর্যোগ সচেতনতা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। পাঠ্যক্রম সংশোধনের প্রক্রিয়ায় জলবায়ু শিক্ষাকে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। সম্প্রতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, নারী গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেশি। নারীদের জন্য যে সুযোগের সমতা রয়েছে, তা বহুবিধ শর্তের ওপর নির্ভর করে। এছাড়াও, যারা শিক্ষা নিয়ে বের হচ্ছে, তারা কাজের উপযোগী দক্ষতা নিয়ে বের হচ্ছে না।

 মহেশখালীর মতো সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলে সুনির্দিষ্ট কৌশলের মাধ্যমে ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা সম্ভব। এ জন্য সৌরশক্তিচালিত ডিজিটাল লার্নিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। অন্ততপক্ষে কম খরচের প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা চালু করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে, শিক্ষকদের ট্রমা-ইনফর্মড পেডাগোজি, জলবায়ু শিক্ষা এবং দুর্যোগকালীন শ্রেণি ব্যবস্থাপনার বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন। দুর্গম অঞ্চলে কর্মরত শিক্ষকদের জন্য বিশেষ ভাতা ও পেশাগত সুযোগ বাড়ানো আবশ্যক। ক্ষতিপূরক শিক্ষা শুধু উপকূলীয় অঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্যই নয়, তা সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী ও প্রতিরোধী করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

 উপকূলীয় অঞ্চলে দুর্যোগের সময় ক্লাস বন্ধ থাকার ক্ষতি পূরণে দূরশিক্ষণ ও ব্লেন্ডেড লার্নিং মডেল তৈরি করলে তা জাতীয় পর্যায়ে আপদকালীন শিক্ষাকাঠামো হিসেবে কাজ করবে। ভবিষ্যতে মহামারি বা অন্য কোনো জাতীয় সংকটে শিক্ষাব্যবস্থার ডিজিটাল ব্যাকআপ প্রস্তুত থাকবে। উপকূলের ক্ষতিপূরক শিক্ষার অংশ হিসেবে স্থানীয় জ্ঞান ও অভিযোজন কৌশলকে পাঠ্যসূচিতে আনা গেলে তা প্রচলিত শিক্ষাক্রমকে জীবনমুখী করবে। পাঠ্যবই সমস্যা সমাধানের হাতিয়ারে রূপান্তরিত হবে।

 দেখতে হবে উপকূলীয় দ্বীপসমূহ বাংলাদেশের বিশেষ ধরনের প্রান্তিক ভূখণ্ড, যেখানে শিক্ষা কেবল একটি সামাজিক সেবা নয়, বরং টিকে থাকা, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রশ্ন। দারিদ্র্য, ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ভাষাগত বৈষম্য এবং সামাজিক বঞ্চনা মিলিতভাবে এখানকার শিশুদের শিক্ষাজীবনকে কঠিন করে তুলেছে। এই বাস্তবতায় ক্ষতিপূরক শিক্ষাকে একটি মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক শিক্ষাদর্শন হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এটি স্বীকার করতে হবে যে, সমতা মানে সবার জন্য একই সুযোগ নয়; বরং যাদের বঞ্চনা বেশি, তাদের জন্য অতিরিক্ত সহায়তা নিশ্চিত করাই সমতা। স্থানীয় পর্যায়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা ও পরিচালন পদ্ধতি নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যেই প্রশ্ন আছে। শিক্ষাক্ষেত্রে শুধু শিক্ষাবান্ধব নয়, দরকার আইডিয়া বান্ধব উদ্ভাবনী মানসিকতার শিক্ষাব্যবস্থাপক।  

 উপকূলীয় প্রান্তিক সমাজকে শিক্ষার মূলধারায় ফিরিয়ে আনা কেবল একটি সামাজিক ন্যায় নয়, এটি মানবিক রাষ্ট্র গঠনের একটি মৌলিক শর্ত। ক্ষতিপূরক শিক্ষাকে অর্থনৈতিক নীতির ভিত্তিতে নয়, গণতন্ত্রায়নের রাজনৈতিক দর্শনের আওতায় বিবেচনা করতে হবে। এটাকে দেখতে হবে শিক্ষাকেন্দ্রিক ন্যায় হিসেবে।

 

[শিক্ষা বিষয়ক একটি অনুষ্ঠানে আমার দেওয়া সাম্প্রতিক বক্তব্যের সারসংক্ষেপ]

 

সরওয়ার কামাল ।। লেখক ও গবেষক। 

 

সরওয়ার কামাল ।। লেখক ও গবেষক।

Comments

Popular posts from this blog

মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার কারণ ও প্রতিকার

সরওয়ার কামাল শিক্ষাক্ষেত্রে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সাফল্য রয়েছে। সামাজিক উন্নয়ন সূচকেও বাংলাদেশের অবস্থান প্রতিবেশি দেশগুলোর তুলনায় ভালো, যা সম্পর্কে প্রশংসা করে বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন প্রবন্ধ লিখেছেন “ ল্যানসেট ” নামক মেডিক্যাল জার্নালে। কিন্তু এতে আমাদের বগল বাজিয়ে আত্মতৃপ্তিতে ভোগার অবকাশ নেই। কারণ শিক্ষার্থী ঝরে পড়া এবং বিজ্ঞান শিক্ষা সংকুচিত হয়ে পড়া আমাদের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভুত হয়েছে। শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার কারণে আমাদের শিক্ষার মূল লক্ষ্যগুলো হাসিল হচ্ছে না, যার একটি হলো সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করা, অপরটি হলো শিক্ষাক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় প্রণোদনার ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করা। অর্থাৎ সব শিশুই যাতে সরকারের সুযোগ ব্যবহার করে উন্নত জীবনের সন্ধান করতে পারে, তার শতভাগ নিশ্চয়তা প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না। শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার বিভিন্ন কারণ রয়েছে, তার মধ্যে বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন কারণ রয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার প্রধান কারণ দারিদ্র্য ও অপুষ্টি বা স্বাস্থ্যহীনতা । মাধ্যমিক পর্যায়েও শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার ক্ষেত্রে দারিদ্র্য সমস্যার ...

মহেশখালীর সমাজ ও সংস্কৃতি

সরওয়ার কামাল সাগর কূলে গিরিকুন্তলা মোহিনী মহেশখালী দ্বীপের ৩৮৮ বর্গকিলোমিটার ভূত্বকে প্রায় পাঁচ লক্ষ লোকের বসতি। তাদের বসতি ঘিরে গড়ে উঠেছে উপকূলীয়-দ্বীপাঞ্চলীয় সমাজ। এই সমাজসভ্যদের মানসিক ঐক্য ও জীবনযাপন পদ্ধতি নিয়ে তৈরি হয়েছে শনাক্তযোগ্য বিশেষ স্থানীয় সংস্কৃতি। মানবজাতির চিরকালীন অভিযাত্রার অংশ হিসেবে দেশের নানা জায়গা থেকে হিজরত করে লোকজন এসে বসতি গেড়েছে মহেশখালীতে। তাই তাদের ভাষা ও আচরণে শনাক্ত করা যায় এমন বৈচিত্র্য ও তারতম্য, যা দিয়ে কক্সবাজারের অন্যান্য অঞ্চলের অধিবাসীদের তুলনায় মহেশখালীবাসীকে স্বতন্ত্রভাবে চিহ্নিত করা যায়। যে পার্থক্যসূচক বৈশিষ্ঠ্যাবলী নিয়ে মহেশখালীর সমাজ ও মানুষের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য তৈরি হয়েছে, চাটগাঁইয়া ভাষার উপভাষাতুল্য মহেশখালীর দ্বীপাঞ্চলীয় বুলি তার মধ্যে বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। [1] তবে সমস্যা হলো, লিখিত সাহিত্য ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের অভাবে স্থানীয় ইতিহাসের মতোই কালিক সূচকের নিরিখে এর জনসংস্কৃতি বর্ণনা করা দুরূহ। একেতো সংস্কৃতি স্বয়ং একটি ব্যাপক ধারণা, তদুপরি, এটি সতত পরিবর্তনশীল। ভাষা ও সংস্কৃতি স্রোতস্বী নদীর মতো বহমান। মানুষের কথা, স্মৃতি, পুরা...

মনোদর্শন

মনোদর্শনের কথামুখ দর্শনের একটি সরল সংজ্ঞার অভিপ্রায়ে আমরা বলতে পারি, দর্শন হলো জীবন, জগত ও পরমসত্তার প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে যৌক্তিক ও সার্বিক ব্যাখ্যা দানের প্রচেষ্টা। অনুরূপভাবে বলা যায়, মনোদর্শন হলো দর্শনের সেই শাখা যেখানে মনস্তত্ত্বের দর্শন বা দর্শনের মনস্তত্ত্বসহ মানসিক বিষয় কিংবা মানসিক প্রপঞ্চের স্বরূপ নিয়ে আলোচনা করা হয়, যে বিষয়গুলো কার্যকারণগত দিক থেকে সত্তার কাঠামোর সাথে সম্পর্কিত। মূলত মনোদর্শন হলো মন, মনের ধারণা, মনের স্বরূপ, মানসিক ঘটনা, মনের কার্যাবলি, চেতনা ও সর্বোপরি দেহের সাথে চেতনার সম্পর্ক নিয়ে দার্শনিক অনুসন্ধানের প্রয়াস। আরও বিস্তৃত পরিসরে মনোদর্শনের বিষয়বস্তু নিয়ে আলাপের অবতারণা করলে মনের ধারণা, চেতনার স্বরূপ, প্রত্যক্ষন, সংবেদন, চেতনা, চেতনার কর্তা, আত্মজ্ঞান, অন্তর্দর্শন, কল্পনা, বিশ্বাস, আকাংক্ষা, অভিপ্রায়, দৈহিক ঘটনার সাথে মানসিক অবস্থার সম্পর্ক, অভিন্নতাতত্ত্ব, ব্যক্তিত্ব, মনোবিজ্ঞানের অন্যান্য প্রত্যয়, তত্ত্ব ও মডেলসহ নানা প্রসঙ্গ নিয়ে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করতে হয়। কাজেই দর্শনের একটি নতুন শাখা হলেও মনোদর্শনের বিষয়বস্তু যথেষ্ট সমৃদ্ধ, জটিল ও আন্তর্বৈষয়িক ...