সরওয়ার কামাল
বিপন্ন মানুষের প্রতি সহানুভূতি, সংহতি ও সহযোগিতা একটি সহজাত মানবীয় প্রবণতা, যার প্রভাবে সমাজপত্তনের সূচনাকাল থেকেই মানুষ নানাবিধ মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে প্রবৃত্ত রয়েছে। যে কোনো দুর্যোগ পরিস্থিতিতে মানবিক সাড়াদানের ধরন হিসেবে ভিক্ষা, ঋণ, ত্রাণ, যাকাত, দাতব্য চিকিৎসা, এবং কাজের বিনিময়ে খাদ্য সহায়তা প্রদানের চল রয়েছে। কালানুক্রমে বিবর্তিত প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্যেও মানবিক সহায়তা কার্যক্রম রাষ্ট্রের মৌলিক সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে অক্ষুণ্ণ রয়েছে। আধুনিক বিশ্বে প্রচলিত সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির যোগ রয়েছে জার্মানির বিসমার্ক কর্তৃক প্রবর্তিত কল্যাণরাষ্ট্রের ধারণার। তিনি ১৮৮০ সালে য়ুরোপে প্রথমবারের মতো স্বাস্থ্য, দুর্ঘটনা, পঙ্গুত্ব ও বার্ধক্যকেন্দ্রিক ঝুঁকি নিরসনে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। বাংলাদেশেও স্বাধীনতাত্তোরকালে ত্রাণ কার্যক্রম হিসেবে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি শুরু হয়। তা আশির দশকে সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনী এবং ২০১৫ সাল থেকে কৌশলগতভাবে জীবনচক্রভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমে রূপ নিয়েছে। বর্তমান ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশে ২৫টি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৯০টি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু রয়েছে। তার মধ্যে ৪৮টি কর্মসূচি সরাসরি দরিদ্রবান্ধব। কর্মসূচি নির্ধারণের ক্ষেত্রে জেন্ডার, বার্ধক্য, পঙ্গুত্ব, দুঃস্থ, এতিমদের অসহায়ত্ব, নগর-দারিদ্র্য, পুনর্বাসন, পুষ্টি, শিক্ষা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বেকারত্ব দূরীকরণ, দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মতো নীতি ও লক্ষ্যসমূহ সমন্বিত করা হয়েছে। এসব কার্যক্রমে সুবিধাভোগী নির্বাচন, ঘাটতি পূরণ এবং সহায়তার দ্বিত্বতা দূরীকরণের চ্যালেঞ্জ ছিলো। কারণ, সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা কাকে দেওয়া হবে, এ প্রশ্ন শুধু মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা, সম্পদ, আয় ও দারিদ্র্য পরিমাপের বিষয় নয়। এটি একইসাথে নৈতিক, ভাবাদর্শিক এবং সামাজিক পছন্দ চয়নের বিষয়। বিবেচনাবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতার কারণে একেতো কাকে সুবিধা দেওয়া যায়, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, তদুপরি প্রকৃত দরিদ্র এবং সুবিধাবঞ্চিত নিরূপণের পদ্ধতি নিয়েও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ধারণাগত মতান্তর রয়েছে। অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন দেখিয়েছেন, একজন ধনী কিন্তু অসুস্থ এবং একজন সুস্থ কিন্তু দরিদ্র মানুষের সামর্থ্য ও প্রকৃত স্বাধীনতা এক নয়। এছাড়াও, একই আয় থাকা সত্ত্বেও একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সামাজিক অংশগ্রহণের সক্ষমতা সমান নয়। মানুষের ভালোমন্দ কেবল সম্পদ দ্বারা নির্ধারিত হয় না, নির্ধারিত হয় সেই সম্পদ ব্যবহারের সক্ষমতা দ্বারা। নোবেল বিজয়ী অভিজিৎ ব্যানার্জি তার ‘পুয়র ইকোনমিক্স’ বইতে দেখিয়েছেন, দারিদ্র্য কোনো মানুষের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়। বরং অনিশ্চয়তার পরিবেশই মানুষকে দরিদ্র করে তোলে। সামাজিক নিরাপত্তা এই অনিশ্চয়তা কমায়।
সামাজিক
নিরাপত্তা খাতে প্রতিবছর বিপুল অর্থ ব্যয় করা হলেও প্রকৃত প্রাপ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের
সহায়তা প্রাপ্তি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার অভাব ছিলো। সেই পরিপ্রেক্ষিতে,
বর্তমান সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী কল্যাণরাষ্ট্রের ধারণা নিয়ে খাল খনন, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের জন্য ভাতা, ফিডিং, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খেলোয়াড় কার্ড এবং ই-হেলথ কার্ড চালু করেছে।
স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য সুবিধাভোগী নির্বাচন ও যাচাইবাছাইয়ের ক্ষেত্রে এখন জাতীয়
পরিচয়পত্র ও ইন্টার-অপারেবল সিঙ্গেল রেজিস্ট্রি এমআইএস ব্যবহার করা হচ্ছে। সরকার সামাজিক
নিরাপত্তা ও সমাজকল্যাণের গণতন্ত্রায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করছে।
সামাজিক
নিরাপত্তাকে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কেবল একটি ‘আর্থিক সহায়তা’ হিসেবে নয়, বরং সমকালে
এটিকে একটি মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে গণ্য করা হয়। কারণ, মানবাধিকারের মূল ভিত্তি হলো
মানুষের মানবিক মর্যাদা। সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা মানুষকে চরম দারিদ্র্য, ক্ষুধা
এবং অসহায়ত্ব থেকে রক্ষা করে। অসুস্থতা, বার্ধক্য বা বেকারত্বের কারণে উপার্জন করতে
অক্ষম এমন নাগরিককে মানবেতর অবস্থা থেকে মুক্তি দেওয়ার মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা মানুষের
মানবিক মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে ভূমিকা রাখে। সেই প্রেক্ষাপটে কেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধি
নয়, মানবমর্যাদা রক্ষা করাও এখন অর্থনৈতিক দর্শনের অংশ।
জাতিসংঘের
সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের (১৯৪৮) অনুচ্ছেদ ২২ ও ২৫ অনুযায়ী সমাজের প্রত্যেক সদস্যের
সামাজিক নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। একইভাবে, বেকারত্ব, অসুস্থতা, পঙ্গুত্ব, বৈধব্য,
বার্ধক্য বা মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরের অন্য কোনো কারণে জীবনধারণের উপায় হারিয়ে ফেললে
নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। ১৯৬৬ সালে গৃহীত Internanational Covenant on Economic, Social and
Cultural Rights (ICESCR) -এর ৯ নম্বর
অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রসমূহকে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আইনগত বাধ্যবাধকতার আওতায় নিয়ে
আসে।
সামাজিক
নিরাপত্তাকে একটি 'ইতিবাচক অধিকার' হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। এটি ছাড়া মানুষের অন্যবিধ অধিকার (যেমন শিক্ষার অধিকার বা কাজের অধিকার) অর্থহীন হয়ে পড়ে। মানুষে
মানুষে বৈষম্য ও অসমতা দূর করে সাম্য প্রতিষ্ঠা করা মানবাধিকারের লক্ষ্য। সামাজিক নিরাপত্তা
সমাজের সুবিধাবঞ্চিত বা পিছিয়ে পড়া মানুষের (যেমন প্রতিবন্ধী বা অতিদরিদ্র) বিশেষ সুরক্ষা
প্রদান করে। এটি সম্পদ ও সুযোগের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করার মাধ্যমে সমাজে ন্যায় নিশ্চিত
করে। উল্লেখ্য, মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার সবচেয়ে বড় মানবাধিকার। যখন কোনো
ব্যক্তি খাদ্যাভাব বা চিকিৎসার অভাবে ঝুঁকির মুখে পড়েন, তখন সামাজিক নিরাপত্তা তার
বেঁচে থাকার অধিকারকে সুরক্ষা দেয়। তাই সামাজিক নিরাপত্তা কোনো দান বা করুণা
নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের ওপর একটি আইনি ও নৈতিক বাধ্যবাধকতা। এটি নাগরিকের সেই রক্ষাকবচ,
যা তাকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা দেয়।
বাংলাদেশ
সরকার অনেকগুলো আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতির সাথে সঙ্গতি রেখে দারিদ্র্য দূরীকরণ, বৈষম্য
নিরসন এবং অসমতা কমানোর লক্ষ্যে কাজ করছে। জাতিসংঘের আওতায় ১৯৯৫ সালের কোপেনহেগেন ঘোষণা
এবং ২০২৫ সালের সামাজিক উন্নয়ন সংক্রান্ত দোহা পলিটিক্যাল ডিক্লারেশনে রাষ্ট্রসমূহের
সামাজিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলায়
অভিযোজনমূলক এবং দুর্যোগসংবেদনশীল নীতিমালা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। ২০২১ সালে টোকিওতে
N4G সামিটে বাংলাদেশ জীবনচক্রভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা
কর্মসূচি ব্যবহার করে পুষ্টি সেবায় বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ২০২৫ সালে
ফ্রান্সের প্যারিসে অনুষ্ঠিত সামিটে পুষ্টি, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তাকে একসাথে
দেখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সামাজিক
নিরাপত্তা সহায়তা কি অধিকারভিত্তিক, নাকি দারিদ্র্য-কেন্দ্রিক রাষ্ট্রীয় সহায়তা, তা
নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও সরকার স্পষ্টভাবে সামাজিক নিরাপত্তাকে অধিকার
হিসেবে স্বীকার করে। সামাজিক চুক্তি তত্ত্ব অনুযায়ী নাগরিকদের জীবন, সম্পদ ও নিরাপত্তা
বিধানের সাথে সাথে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা প্রদান করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। বাংলাদেশের
সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫(ঘ)-তে সামাজিক নিরাপত্তাকে মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া
হয়েছে। এর মাধ্যমে বেকারত্ব, অসুস্থতা, পঙ্গুত্ব, বার্ধক্য, বৈধব্য ও এতিম ও দুঃস্থ-অসহায়ত্ব
নিবারণে সামাজিক সুরক্ষার রাষ্ট্রীয় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
সরওয়ার
কামাল ।। গবেষক ও লেখক।
Comments